পলাশীঃ ২ – DEL H KHAN

মুহুর্মুহু তোপধ্বনিতে পলাশীর প্রান্তর কেপে উঠল। জোড়া পুকুরের পাশে নবাব সিরাজের ‘এডভান্স পজিশন’ থেকে সিনফ্রের ফ্রেঞ্চ ব্যাটারি ফায়ার ওপেন করার সাথে সাথে বেঙ্গল আর্টিলারির সবকয়টা কামান একযোগে গর্জে উঠল। যদিও প্রথম ভলি অফ ফায়ারের বেশিরভাগ গোলাই ওভার হেড হল; ক্লাইভের বাহিনীর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আমবাগানের ওপর আছড়ে পরল।

কিন্তু নবাবের গানাররা দ্রুতই তাদের কামানের রেঞ্জ এডজাস্ট করে নিল। বেঙ্গল আর্টিলারির এই কন্সেন্ট্রেটেড ফায়ারের কারনে ক্লাইভ বাহিনীর ওপর যেন নরক নেমে এল; আধাঘন্টার ভেতর আরো ত্রিশজন ইংলিশ সৈন্য হতাহত হল। কিন্তু লোয়ার ক্যালিবারের কারনে ইংলিশ কামানের গোলা নবাব বাহিনী পর্যন্ত পৌছাতেই পারছে না।

যুদ্ধ শুরু হয়েছে ১৭৫৭ সালের যুদ্ধের ট্রেন্ড মতেই। কামান আবিস্কারের পর থেকে যুদ্ধের শুরুতেই কামানগুলো নিজ আর্মির পুরোভাগে ডেপ্লয় করা হয়। উদ্দেশ্য হল নিরাপদ দূরত্বে থেকেই কামান দেগে শত্রুর যতটা সম্ভব ক্ষতি করে নেয়া।

ইনফেন্ট্রি ব্যাটেল মানেই ক্লোজ কোয়ার্টারে লড়াই, এতে কেওয়াস আর কনফিউশন এত বেশি যে যুদ্ধ শেষ হবার আগ পর্যন্ত জয় পরাজয় আন্দাজ করা কঠিন। কিন্তু সঠিকভাবে আর্টিলারি কাজে লাগাতে পারলে এর মাধ্যমে শত্রুর লাইন আর ফাইল এলোমেলো করে দেয়া যেত, গোলার আঘাতে হতাহতদের করুন আর্তনাদে আতংক ছড়িয়ে পরত যুদ্ধের শুরুতেই।

এছাড়াও ফ্রন্টের লাইন আর ফাইলের এই ড্যামেজ মিটিগেট করতে যুদ্ধের শুরুতেই প্রতিপক্ষকে পেছন থেকে তার রিজার্ভ সামনে এনে কমিট করতে হত। ফলে যার আর্টিলারি বেটার সে ইনফেন্ট্রি ব্যাটেলে নিউমেরিক সুপেরিওরিটির এডভান্টেজ পেত।

কামানের গোলা শেষ হয়ে গেলে এবার ইনফেন্ট্রি ইউনিটগুলো ধেয়ে যেত। ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটেল চলার সময়ই ফ্রন্ট, ফ্ল্যানক অথবা রিয়ার থেকে ক্যাভালরি চার্জ করা হত নিজ ইনফ্যান্ট্রি ইউনিটের ওপর চাপ কমাতে অথবা আটকা পড়া ইউনিট উদ্ধার করতে।

নবাব আর্টিলারর গোলার আঘাতে অযথা সৈন্যক্ষয় এড়াতে অগত্যা ক্লাইভ তার সৈন্যদের খোলা মাঠ থেকে পিছু হটে আমবাগানের ভেতর ঢুকে ডিফেন্স নেবার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পেয়েই ইংলিশরা তাদের কামান সহ আমবাগানের ভেতর আশ্রয় নিল। শুধু আমবাগানের সামনের ইটভাটায় দুটো ইংলিশ কামান ইটভাটার দেয়ালের কাভার নিয়ে ইংরেজ বাহিনীর ‘এডভান্স পজিশন’ হিসেবে রয়ে গেল।

ইংরেজ সৈন্যরা পিছুহটে আমবাগানের ভেতর সেঁধিয়ে যেতেই নবাবের আর্টিলারির তেজ যেন আরো বেড়ে গেল। ইংরেজদের পিছু হঠতে দেখে উত্তেজিত নবাব সিরাজ তার আর্টিলারি ব্যাটারিগুলোকে আরো এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন, যেন আর্টিলারি দিয়েই আজকের যুদ্ধের ফয়সালা করে ফেলতে চাইলেন। কিন্তু নবাবের আর্টিলারি ইফেক্টিভ রেঞ্জে না আসা পর্যন্ত ক্লাইভ তার কামানগুলোকে অযথা গোলা নষ্ট করতে নিষেধ করে দিলেন।

এই আর্টিলারি ডুয়েল সহসাই থামবে বলে মনে হচ্ছেনা। নবাবের আর্টিলারি সর্বশক্তি দিয়ে চেস্টা করছে, কিন্তু লাক্ষা আমবাগানের আমগাছ গুলো শিল্ডের মতই বেশিরভাগ গোলা আটকে দিচ্ছে, ফলে ইংরেজদের ক্ষয়ক্ষতি তেমন হচ্ছেনা। তাই নির্ভার ক্লাইভ এবার তার ‘কমান্ড পোস্ট’ এ বসে আজকের যুদ্ধের রেজাল্ট কী হবে সেই ভাবনাটা ক্লাইভ জোর করেই মাথা থেকে সরিয়ে দেবার চেস্টা করলেন। তিনি বরং অস্থির বোধ করছেন মীর জাফরের রোল নিয়ে। সে কী শেষ অবধি ক্লাইভের সাথে থাকবে কিনা তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে না।

অস্থিরতা কমাতে ক্লাইভ তার গাজার কল্কেতে কষে কয়েকটা দম দিয়ে নিলেন। ইন্ডিয়ায় এসে ইদানিং এই নতুন নেশায় ক্লাইভ বুদ প্রায়, নার্ভ ধরে রাখতে ক্লাইভের কাছে এর জুড়ি নেই। ধাতস্ত হবার চেস্টা করতে করতে ক্লাইভ ভাবলেন, এই অতিরিক্ত গঞ্জিকাসেবনই হয়ত একদিন তার কাল হবে!

নেশাটা চেপে বসতেই ক্লাইভ মহান ইংলিশ জাতির অতীত আর ভবিষ্যত নিয়ে ভাবুক বোধ করেন। তার মানসপটে এই প্রাচ্যদেশে ইংলিশদের পদার্পনের ইতিহাস ভেসে ওঠে। লন্ডনে “ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী” নামের যে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিটা গড়ে উঠেছিল, শুরুতে তার উদ্দেশ্যটা কিন্তু ছিল স্রেফ বানিজ্যই। ১৬০০ সালে রানী ১ম এলিজাবেথের কাছ থেকে ১৫ বছরের জন্য অনুমতি পেয়ে তাদের পূর্বপুরুষরা সুমাত্রা, মালাক্কা আর যবদ্বীপের উদ্দেশ্যে পাল তোলেন।

১৬০৮ সালে ক্যাপ্টেন হকিংস মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে এসে হাজির হন। মোঘল সাম্রাজ্যের তখন রমরমা অবস্থা, দরবারে হরেক দেশের লোকজনের আনাগোনা। তাই ইংলিশরা আলাদা কোন প্রমিনেন্স গড়তে ব্যর্থ হল, তবে মুম্বাইর কাছে সুরেট বন্দরে ব্যবসা করার জন্য একটা কুঠি স্থাপনের অনুমতি তারা ঠিকই বাগিয়ে নিল।

এরপর এলেন টমাস রো, মুঘল দরবারে ইংলিশ রাজ দূত হিসেবে তিনি ভারতের আরো বেশ কয়েক জায়গায় ইংলিশদের ব্যবসা বাড়িয়ে নিলেন। ইন দ্য মিন টাইম জাহাঙ্গীর গিয়ে শাহজাহান হলেন মুঘল সাম্রাজ্যের নতুন কর্ণধার। একদিন তার কন্যা জাহানারার দাসীর গায়ে আগুন লেগে গেল। সে আগুন নেভাতে গিয়ে শাহজাদিও অগ্নিদগ্ধ হলেন। দেশীয় হাকিমরা যখন জাহানারাকে সারাতে ব্যর্থ তখন ইংরেজ চিকিৎসক গাব্রিয়েল বাটন তাকে সুস্থ করে তোলেন।

এতদিনে ইংলিশরা মুঘল দরবারে তাদের বহুল কাংখিত স্পেস খুঁজে পেল। খুশি হয়ে কৃতজ্ঞ সম্রাট বাংলায় ইংলিশদের আংশিক বানিজ্যের অধিকার দিয়ে শাহী ফরমান জারি করেন। পরে বাউটন বাংলার সুবেদার শাহজাদা সুজার পারিবারিক চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান। সেই সুযোগে বাউটন মাত্র ৩০০০ হাজার টাকা বার্ষিক নজরানার বিনিময়ে ইংরেজদেরকে বাংলায় ট্যাক্স ফ্রি বানিজ্য করার ‘দস্তক’ আদায় করে নেন।

সুযোগটা লুফে নিয়ে ইংলিশরা হুগলী, পাটনা, ঢাকা, মালদহ ও কাশিমবাজারে কুঠি স্থাপন করে এবং ব্যবসা বাড়াতে থাকে। ১৬৯০ সালে কোলকাতায় কোম্পানির প্রধান বানিজ্য কুঠি ও স্থায়ী বাসস্থান নির্মিত হয়। সাতহাজার পাউন্ড এর বিনিয়োগ একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় এক লক্ষ পনের হাজার পাউন্ডে।

বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান ছিলেন টাফ এডমিনিস্ট্রেটর; তার সময় টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেত। কিন্তু ইব্রাহীম খান বাংলার সুবেদার হবার পর ১৬৯৫ সালে সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ অবনতি হয়। এই সুযোগে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ইংলিশরা প্রধান কুঠিতে দুর্গ নির্মানের অনুমতি আদায় করে নেয়। ফলে ১৬৯৬ সালে সুতানুটি কুঠিতে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ গড়ে উঠল।

মুঘল সম্রাট যখন আওরঙ্গজেব তখন তার নাতি আজিম-উস-শান বাংলার সুবেদার। তিনি নিজে ১৬ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে বার্ষিক মাত্র ১২শ টাকা খাজনা প্রদানের ভিত্তিতে ইংলিশদের কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর নামক তিনটি গ্রামের জমিদারী দিয়ে দিলেন। ফলে “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী” এবার বাংলার পলিটিক্সে এক্টিভলি ইনভলভড হবার টিকেট পেয়ে গেল।

১৭০৭ সালে বাংলার আরেক ‘হার্ড নাট’ সুবেদার মুর্শিদকুলি খাঁ সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ইংলিশদের জন্য দেয়া মুঘল ফরমানের মেয়াদ শেষ বলে কাশিমবাজার, রাজমহল ও পাটনায় ইংরেজ কুঠি সিলগালা করে দেন। কিন্তু ১৭১৭ সালে সম্রাট ফররুখ মিয়ার ইংরেজ চিকিৎসক হ্যামিলটনের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আবার কোম্পানীকে প্রায় বিনা শুল্কে সমগ্র ভারতবর্ষে বানিজ্য করার লাইসেন্স দিয়ে দিলেন। যার ফলে কোম্পানী বাংলাদেশের স্থল ও নৌ পথে বানিজ্যের সুযোগ পেল এবং কোলকাতার নিকটবর্তী ৩৮টি গ্রামের মালিকানার অধিকার সহ নিজস্ব মুদ্রা তৈরী করার অনুমতি পেল।

মুর্শিদকুলি খাঁ মারা গেলে তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন বাংলার নবাব হন। তখন বাংলার সাথে উড়িষ্যা ও বিহার যুক্ত হয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা নামে একটি নতুন সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। সুজাউদ্দিনের মৃতুর পর তাঁর দুর্বল পুত্র সরফরাজ খাঁ নবাব হলেন। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্য ততদিনে এর ধার হারাতে শুরু করেছে। ফলে ইংলিশরা এবার কলোনাইজেশনের স্বপ্ন বুনতে শুরু করে দিল; মুঘলরা পারলে ইংলিশরাও একদিন নিশ্চয় এদেশ শাসন করতে পারবে।

কিন্তু সরফরাজ খানকে হারিয়ে আলীবর্দী খান যখন নবাব হলেন, ইংলিশরা ফের নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হতে লাগল। আলীবর্দী ছিলেন যোগ্য শাসক, কিন্তু একদিকে মারাঠা বর্গীদের উপদ্রব আর অন্যদিকে রাজদরবারের আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র তার ১৬ বছরের শাসনকালকে কঠিন করে তুলেছিল। সেই সাথে তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে ইংলিশরা অনবরত তার প্রতিপক্ষদের সব রকমের ইন্ধন যুগিয়ে গেছে এবং তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে ইংরেজরা নবাবকে প্রায় অমান্যই করতে শুরু করেদিল।

14718880_10209391364493060_7346642927842191167_n

আলীবর্দী খানের মৃতুর পর হিন্দু রাজা মহারাজা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এবং হিন্দু রাজ কর্মচারীদের মুসলিম নবাব বিরোধী ষড়যন্ত্র এবং চরম পারিবারিক কলহের মধ্যে তার নাতি সিরাজউদ্দৌলা নবাব হলেন। ইংলিশদের ক্রমবর্ধমান এরোগেন্স থেকে সিরাজউদ্দৌলা টের পেয়েছিলেন যে এরাই বাংলার স্বাধীনতার জন্য সবচে বড় হুমকি। তার দরবারের বিশ্বাসঘাতক কর্মচারীদের সাথে ইংরেজদের গোপন ষড়যন্ত্রের বিষয়ও সিরাজ ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাই নবাব হবার পরপরই তিনি ইংরেজদের ফিক্স করাকে তার প্রায়োরিটি ওয়ান ভাবলেন।

১৭৫৬ সালের ১৩ জুন নবাব সিরাজ ফোর্ট উইলিয়ামে পৌছান এবং কোলকাতা অবরোধ করেন এবং ২০ জুন ১৭৫৬ তারিখে কোলকাতার পতন ঘটে। এ খবর মাদ্রাজ পৌঁছলে রবার্ট ক্লাইভ ইউরোপ থেকে আগত ২ হাজার সৈন্যসহ কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং ১৭৫৭ সালের ২ জানুয়ারী কলকাতা পূনর্দখল করে নেন।

কিন্তু জানুয়ারির ২০ তারিখ নবাব সিরাজউদ্দৌলা আবারো কলকাতা দখল করেন এবং মানিক চাঁদকে কলকাতা রক্ষার দায়িত্ব দেন। কিন্তু মানিকচাঁদ, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, রায়দুলর্ভ ও নন্দকুমাররা মিলে ঘুষের বিনিময়ে ফের কোলকাতাকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়।

সিরাজ তখন আফগান অধিপতি আহমদশাহ আবদালীর আক্রমনের হুমকি থেকে মুর্শিদাবাদকে রক্ষা করতে ব্যস্ত। এদিকে ইংলিশরাও সিরাজের বিরুদ্ধে চরম আঘাত হানার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরো কিছুটা সময়ের প্রয়োজন অনুভব করছিল। ফলে ১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে ‘আলীনগর চুক্তি’ হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী ইংরেজরা কোলকাতা ফিরে গিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ মেরামত ও নির্মানের কাজ শুরু করে। আর সিরাজউদ্দৌলা ১৭১৭ সালের মোঘল বাদশাহের ফরমানের মাধ্যমে ইংরেজদের প্রদত্ত সুবিধা সমুহ মেনে নেন।

হঠাত প্রচণ্ড তোপধ্বনিতে ক্লাইভ সচকিত হয়ে তার কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এলেন। কমান্ড পোস্টের বাইরে এসে দেখতে পেলেন নবাবের আর্টিলারি বিপদজনক রকম কাছে পৌছে যাচ্ছে। মেজর কালপেট্রিক এসে জানাল যে নবাবের আর্টিলারি এখন ইংলিশ কামানের শ্যুটিং রেঞ্জের মধ্যে এসে পৌছেছে।

আর কালক্ষেপণ না করে ক্লাইভ তার সব কয়টা কামান একযোগে দাগানোর নির্দেশ দিলেন। আচমকা আক্রান্ত হয়ে নবাব আর্টিলারি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে থমকে দাড়াল, তারপর প্রান বাচাতে প্রাণপণ পিছু হটতে শুরু করল।

 

বিঃদ্রঃ এটি লিখেছেন Del. H. Khan ভাইয়া। মূল লেখাটি পাবেন এখানে । ভাল লাগলো লেখাটা তাই পরে খুঁজে পেতে সুবিধা হওয়ার জন্য তুলে রাখলাম।

Advertisements

পলাশীঃ ১ – Del H Khan

ফ্রেঞ্চ আর্টিলারি অফিসার মশিয়ে সিনফ্রে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না!
নবাব সিরাজের বেঙল আর্মি পিছু হটছে!!
স্রেফ একটা সফল ইংলিশ ‘স্পয়েলিং এটাক’ এর কারনে জেতা একটা যুদ্ধে হার মেনে নেয়া বুঝি শুধুমাত্র এই বঙ্গজদের পক্ষেই সম্ভব!!!

অথচ আজ সকালেও ক্লাইভ ভাবেনি এই যুদ্ধ তাদের পক্ষে জেতা সম্ভব। পলাশীর প্রান্তরে নবাবের বেঙ্গল আর্মির ‘এরে অফ ফোর্স’ দেখেই ক্লাইভের গলা শুকিয়ে আসছিল।

ভাগীরথী নদীর পাড়েই একটা আমবাগান, আয়তনে প্রায় এক স্কয়ার কিলোমিটার। আমবাগানের সামনে (উঃ), ডানে (পূঃ) আর পেছনে (দঃ) পলাশীর খোলা প্রান্তর।

আমবাগানের সামনের প্রান্তে একটা পরিত্যক্ত ‘হান্টিং লজ’, তারও শ’তিনেক গজ সামনে নদীর পাড়েই একটা ইটভাটা। ইটভাটার আরো সামনে জোড়া পুকুর, একটা বড়, আরেকটা ছোট। তারো সামনে বুক সমান উচু ঢাল; ভাগীরথীর পাড় থেকে শুরু হয়ে আমবাগানের উত্তর প্রান্তের সমান্তরালে পলাশীর প্রান্তরের মাঝ দিয়ে সেই ঢাল পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে চলে গেছে।

ঢালের ওপারেই বেঙল আর্মির মেইন ক্যাম্প; বোঝাই যাচ্ছে ‘মেইন ডাইরেকশন অফ এটাক’ ওটাই। কারন ঢালের সামনেই জোড়া পুকুরের দুই পাড়ে আমবাগানের দিকে তাক করে চারটা কামানের একটা ফ্রেঞ্চ ব্যাটারি বসানো।

কিন্তু বেঙ্গল আর্মির মেইন ক্যাম্প উত্তরে হলেও অন্যান্য বাহিনীগুলোর ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে উত্তর-পূর্ব থেকে শুরু করে বাগানের পূর্ব দিক পর্যন্ত; মানে যুদ্ধ শুরু হলে বেঙ্গল আর্মির ফর্মেশন আমবাগানের সামনে থেকে শুরু করে ক্রিসেন্ট প্যাটার্নে প্রায় আমবাগানের পেছন পর্যন্ত ঘিরে দাঁড়াবে।

ক্লাইভ স্বীকার করতে বাধ্য হল, পছন্দের ব্যাটেলফিল্ডে নবাবের আর্মি ট্যাক্টিক্যালি প্রায় নিখুঁতভাবে ডেপ্লয় করেছে; নবাবের ‘হায়বত জং’ (Horror in War) উপাধি সার্থক। বেঙ্গল আর্মি ফ্রেঞ্চদের বুদ্ধিতে ক্লাইভের ইংলিশ আর্মিকে ফ্রন্ট, ফ্ল্যানক আর রিয়ার থেকে একযোগে ‘থ্রি প্রঞ্জড এটাক’ করলে তো বটেই, এমনকি স্রেফ সামনে থেকে ফ্রন্টাল এটাক করলেও সেই এটাকের ওয়েট এন্ডিউর করার মত ক্ষমতা ক্লাইভের ৩৯ রেজিমেন্টের নেই। কারন ডান ফ্ল্যানকে অথবা পেছনেও নবাবের আর্মি থাকায় একমাত্র পিছু হটবার উপায় হল ভাগীরথী নদী ধরে নৌকায় চেপে ভাটির পথ ধরা।

এতসব ডিজেডভান্টেজের মাঝেও ক্লাইভের এডভান্টেজ দুটো। এক, ব্যাটেলফিল্ডে তার তুরুপের তাস, নবাবের সেনাপ্রধান মীর জাফর। দুই, তরুন নবাব ক্লাইভের ইংলিশ আর্মি আর তাদের ট্যাক্টক্স সম্পর্কে যেমন অজ্ঞ, তেমনি তার জেনারেলদের সিনসিনিয়ারিটি নিয়েও সমানভাবে কনফিউজড!

14666327_10209358716436879_4986234355482384736_n

স্রেফ মীর জাফরের ওপর ষোলআনা ভরসা করে কোন ‘পিচড ব্যাটেল’ এ এনগেজড হবার মত বেকুব ক্লাইভ নন; অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানেন, বিশ্বাসঘাতক কে কখনই বিশ্বাস করতে নেই। অতএব, ক্লাইভ শুরুতেই ভাগীরথীর তীরে ইংলিশদের নৌযানগুলো রেডি রাখবার নির্দেশ দিলেন, যেন চাইলেই অকারন ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে নিরাপদে পিছু হঠতে পারেন। তারপর মাঝে ইংলিশ আর্মি আর টোপাসিদের রেখে দুই ফ্ল্যানকে ভারতীয় কালা সিপাহীদের দাড় করিয়ে আমবাগানের সামনে ব্যাটেল ফর্মেশনে দাড়ানোর নির্দেশ দিলেন।

সেই ১৬০০ সাল থেকে ইংলিশরা এই ইন্ডিয়ানদের স্টাডি করে আসছে। যারা মুঘোলদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে কুন্ঠা করেনি, তারা যে একসময় ইংলিশদের মেনে নিতে দ্বিধা করবে না, সেকথা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কলোনাইজেশনের এই প্রসেসটা ঠিক কবে শুরু হবে তা বলা মুশকিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লাইভ ভাবল, হয়ত এই পলাশীর প্রান্তর থেকেই হবে এর শুরু, কে জানে?

ক্লাইভের ভাবনার জাল ছিন্ন করে দিয়ে নবাবের নির্দেশ পেয়ে মসিয়ে সিনফ্রের ফ্রেঞ্চ ক্যানন ব্যাটারি সকাল ছয়টায় গান ফায়ার শুরু করল। প্রথম গোলার আঘাতে একজন ইংলিশ গানার মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ল, আরেকজন হল গুরুতর আহত।

ক্লাইভ ফ্রেঞ্চ এবং নবাব আর্টিলারির হেভিয়ার ক্যালিবারের ক্যাননের বিপরীতে তার লোয়ার ক্যালিবারের ইংলিশ ক্যাননের অসহায়ত্ব টের পেয়ে প্রমাদ গুনল। গাঁজাখোর ক্লাইভের গতরাতের গাজার হ্যাংওভার মূহুর্তেই উবে গেল। এমনতো হবার কথা ছিলনা!

মন থেকে মীর জাফরকে শাপ শাপান্ত করতে শুরু করল ক্লাইভ। (চলবে… )

বিঃদ্রঃ এটি লিখেছেন Del. H. Khan ভাইয়া। মূল লেখাটি পাবেন এখানে । ভাল লাগলো লেখাটা তাই পরে খুঁজে পেতে সুবিধা হওয়ার জন্য তুলে রাখলাম।